মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে ইরানের কৌশলগত শহর ইসফাহানে মার্কিন বিমানবাহিনী এক বিধ্বংসী হামলা চালিয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবরে বলা হয়েছে, সোমবার দিবাগত রাতে পরিচালিত অভিযানে ২৩০০ পাউন্ড নয়—প্রায় ২ হাজার পাউন্ডজোরের একটি ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা ব্যবহার করা হয়েছে, যে বোমাগুলো মাটির গভীরে থাকা শক্ত নিরাপত্তা স্থাপনা ও সুড়ঙ্গ কেটে ফেলতে সক্ষম। হামলার একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ভিডিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছেন, যেখানে ইসফাহানের একটি বৃহৎ গোলাবারুদ ডিপোতে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের বোমা গোপন বা ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনা ধ্বংসের জন্যই তৈরি, তাই ইসফাহানে ব্যবহৃত হলে তা ওই স্থাপনা পুরোপুরি অকার্যকর করার ক্ষমতা রাখে। হোয়াইট হাউস সূত্রে খবর, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই অভিযান দীর্ঘমেয়াদি করতে চান না; তিনি বলেছেন, আগামী চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের বক্তব্যে বলা হয়েছে, ইরানের নৌবাহিনী ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র স্টকধারণ ধ্বংস করাই প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল এবং সেটি আংশিকভাবে সফল হয়েছে।
তবে হামলার পর হরমুজ প্রণালী এখনো পুরোপুরি মুক্ত হয়নি—এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ—এবং ট্রাম্প জানান যে এই নৌপরিবহন সচল রাখতে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোর স্বার্থ যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে, এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে। এই বক্তব্য বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই তীব্র হয়েছে। তেহরান, কারাজ ও আরদাবিলসহ বিভিন্ন বড় শহরে হাজারো মানুষ রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করেছেন। স্থানীয় গণমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, বিশেষ করে কারাজের একটি বিদ্যুৎ সাব-স্টেশনে হামলার কারণে বড় ধরনের বিদ্যৎ বিভ্রাট সৃষ্টি হলে বিক্ষোভকারীরা ‘সাহস, সাহস!’ স্লোগান দিলেও পুরো এলাকা রণক্ষেত্রের মতো হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা তাদের সামরিক বাহিনীকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে যাননি, বরং মার্কিন ‘আগ্রাসন’ রুখে দেবে এমন শপথও নিয়েছেন।
আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতিক্রিয়াও গ্রাম্য হয়নি। ইরাকভিত্তিক একটি সশস্ত্র সংগঠন হিসেবে পরিচিত ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ সোমবার জানিয়েছে, তারা গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে অন্তত ১৯টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সংগঠনটির দাবি—এগুলি ইরানের ওপর হামলার প্রতিশোধ ও অঞ্চল থেকে মার্কিন আধিপত্য কমানোর চেষ্টা। এমন পাল্টা আঘাতের ফলে ওই অঞ্চলে মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে, বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন।
আর্থিক বাজারেও এই সংঘাতের প্রভাব স্পষ্ট। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম চতুর্থ দিন ধরে বাড়ছে; ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে—এখন থেকে মূল্যস্ফীতি ও সরবরাহ সংকট নিয়ে নতুন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, যদি হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারের কাছাকাছি তুলে নেওয়া সম্ভব। তেলের দামের ওঠানামা বিশ্বজুড়ে কৃষি খাতের সার সরবরাহ এবং আধুনিক প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সেমিকন্ডাক্টর চিপস তৈরির সরবরাহ-শৃঙ্খলকেও নড়ে লতিয়ে দিয়েছে।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অচল ও অনিশ্চিত অবস্থার মুখে পড়েছে। একদিকে মার্কিন প্রশাসনের দ্রুত লক্ষ্য অর্জনের ইচ্ছা ও সীমিত সময়ের মধ্যে অভিযান শেষ করার ঘোষণা, অন্যদিকে ইরানের ভেতরে জনরোষ এবং আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে বিশ্ব এখন একটি ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে মোকাবিলা করছে। এই সংকটের পরিমাপ এবং দ্রুত মুলতুবি আনার প্রয়োজন একেবারেই স্পষ্ট, নতুবা বিশ্বশান্তি ও বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও বড় ধাক্কায় পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।









