দৌলতদিয়ায় একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ার ঘটনায় একই পরিবারের তিন সদস্য নিহত হওয়ায় তাদের বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। বুধবার রাতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় নিহতদের স্বজন ডাঃ ইসরাত জাহান রুবা কাঁদতে কাঁদতে আর্তনাদ করেন, ‘‘আমার একমাত্র সোনার ছেলে চলে গেলো। আমার চাঁদের মতো ছেলেকে ছাড়া আমি কিভাবে বাঁচবো?’’
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজবাড়ী পৌরশহর, ভবানীপুরের লাল মিয়া সড়কে নিহতদের বাড়িতে স্বজনদের আহাজারি দেখা গেছে। একই পরিবারের নিহত তিনজন হলেন— রেহেনা আক্তার (৬১), রেহেনা আক্তারের ছোট ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান (২৫) এবং রেহেনা আক্তারের নাতি তাজবীর (৭)। নিহত আহনাফ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন।
ডাঃ ইসরাত জাহান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘‘আমি কিভাবে বাঁচবো তোমাকে ছাড়া (তাজবীর)? কেন আমি পরদিন আমার বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে যাইনি, তাহলে হয়তো সে বেঁচে যেত। আমার ছোট ভাইটাও চলে গেছে।’’ তিনি জানান, দুর্ঘটনার সময় তিনি ঢাকায় ছিলেন এবং বাড়িতে বাচ্চা আসবে ভাবেই রান্না করছিলেন। কিছুই জানা ছিল না; সন্ধ্যায় গোয়ালন্দ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ফোন আসে। এর কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁর এক বন্ধু জানায় তার মা আর নেই, তার ছোট ভাই ও সন্তান নিখোঁজ। পরে জানতে পারেন ছোট ভাই ও একমাত্র সন্তান দুজনেই মারা গেছেন। রাতেই ছেলের লাশ শনাক্ত করতে হয়েছে, আর ছোট ভাইয়ের লাশ সকালে পাওয়া যায়। তাঁর মায়ের লাশও রাতেই গোয়ালন্দ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়েছিল।
ডাঃ ইসরাত স্মৃতিকথায় বলেন, ‘‘ঈদের ছুটি শেষে আমি ঢাকায় যাবার সময় আমার ছেলে বলেছিলো, ‘মা সাবধানে যাও’। আমি তখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম রাতে কার কাছে ঘুমাবে, সে বলল মামার কাছে। এখন মামাও নেই, আমার ছেলেও নেই—দুজন মিলে যেন আমার জীবন থেকে ঝরে পড়েছে।’’
নিহত শিশু তাজবীরের চাচা আতাউল গণি মুক্তাদির জানান, তাদের পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় মিরপুরে থাকেন। তাজবীরের বাবা একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার এবং বর্তমানে সুদানে কর্মরত। তাজবীরের মা একজন চিকিৎসক (ডাঃ ইসরাত)। তাজবীর ইংলিশ মিডিয়ামের প্লে ক্লাসে পড়ত। তিনি বলেন, ‘‘ভাতিজারা ঈদের ছুটিতে রাজবাড়ীতে দাদা-নানার বাড়িতে এসেছিল। ঈদ শেষ করে গতকাল বিকেলে তারা ঢাকার পথে ফেরার সময় দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। তাজবীরের খালা বেঁচে ফিরলেও বাকিরা মারা গেছেন। আমার ভাতিজা আমাদের বংশের প্রদীপ ছিলো—ওকে হারিয়ে আমরা ভীষণভাবে মর্মাহত।’’
স্থানীয়রা জানান, দুর্ঘটনার পরে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে যায় এবং নদী থেকে লাশ উত্তোলন করে। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে মরদেহদের দাফনের প্রস্তুতি এবং বিস্তারিত পরিচয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছে।
ঘটনার তদন্ত ও নিহতদের পরিচয় সংক্রান্ত আরও তথ্য পাওয়া গেলে পরিবার ও জেলা প্রশাসন থেকে পরবর্তী বিজ্ঞপ্তি জানানো হবে।














