নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নজর বাড়ছে এবং সেই মনোভাবের এক প্রতীক হল আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনের সম্প্রতি ঢাকার সফর। তার সরকারি শীর্ষ পর্যায়ের সাক্ষাৎগুলো থেকে পাওয়া সঙ্কেতগুলো দেশটির জন্য আশা জাগায়—বিশেষত পরবর্তী কিস্তি যে মুক্তি পেতে পারে, তার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
২৪ মার্চ ঢাকায় বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনের সঙ্গে সরকারের প্রতিনিধিরা আইএমএফের সম্প্রীতি ও স্থগিত ঋণচুক্তি নিয়ে আলোচনা করেন। ওই সভার ফলশ্রুতিতে পরবর্তী কিস্তি—প্রায় ১.৩০ বিলিয়ন ডলারের—মুক্তির সম্ভাবনা শক্তিশালী হয়েছে বলে কর্মকর্তারা বলছেন।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, এপ্রিলের আইএমএফ বোর্ড বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে উঠবে; সবকিছু সেলার মতো থাকলে আগামী জুলাইয়ে ওই কিস্তি পাওয়া যেতে পারে—এই আশাবাদ তিনি বৈঠকের পরে সাংবাদিকদের জানান।
পটভূমি হিসেবে বলা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইএমএফের ঋণপ্রদান স্থগিত করা হয়েছিল। তখনও সংস্থাটি নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে কিস্তি ছাড়ার আশ্বাস দিয়েছিল, কিন্তু তার কিছুটা মিল থাকতেও নির্দিষ্ট সংস্কারমূলক শর্ত আরোপ করা হয়েছিল।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ধারনা অনুযায়ী, আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় যদি ফলদায়ক অগ্রগতি হয় এবং সরকার ঐ শর্তগুলোর বাস্তবায়নে দায়বদ্ধতা দেখায়, বাংলাদেশ জুনের মধ্যে ডিসেম্বরে বকেয়া থাকা কিস্তিসহ মোট ১.৩০ বিলিয়ন ডলার পেতে পারে।
এ সময় দেশের জ্বালানি আমদানির চাহিদা মাথায় রেখে, ইরান-যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অতিরিক্তভাবে জ্বালানি তেল আমদানের জন্য সরকার আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উৎস থেকে অতিরিক্ত দুই বিলিয়ন ডলার সহায়তা চেয়েছে—এ তথ্য জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল তিতুমীর। এই প্রেক্ষাপটেই আইএমএফের কিস্তি পুনরায় পাওয়া সরকারের কাছে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক চিঠিতে বলা হয়েছে, আইএমএফ শীঘ্রই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসবে এবং কর্মসূচির আওতায় নেওয়া সংস্কারগুলো কীভাবে আগিয়েছে, সেগুলোই প্রধানত আলোচনা হবে। সংস্থাটি নতুন সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিক সহযোগিতাও বজায় রাখতে চায়।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যসহ আইএমএফের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত এখনও পুরোপুরি পূরণ করা যায়নি। বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুনর্গঠন, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার জন্য পুরোপুরি বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালুর মতো বিষয়গুলো মক্যামানিদের অমীমাংসিত তালিকায় রয়ে গেছে।
স্মরণীয়, করোনার মহামারি ও ইউক্রেন সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে চাপের সময় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও আইএমএফের মধ্যে ৪.৭০ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরে কর্মসূচির মেয়াদ বাড়িয়ে আইএমএফ অতিরিক্ত ৮০০ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন করলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলার।
এখন পর্যন্ত পাঁচটি কিস্তিতে মোট ৩.৬৪ বিলিয়ন ডলার পাওয়া গেছে—শুরুতে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৪৭৬.৩ মিলিয়ন ডলার, একই বছরের ডিসেম্বরে ৬৮১ মিলিয়ন ডলার, ২০২৪ সালের জুনে ১.১৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৫ সালের জুনে ১.৩৩ বিলিয়ন ডলার। ফলে এখনও প্রায় ১.৮৬ বিলিয়ন ডলারের বাকি রয়েছে।
গত ডিসেম্বরে আরও একটি কিস্তি দেওয়ার কথা থাকলেও নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা না হওয়া পর্যন্ত তা স্থগিত রাখা হয়েছিল। গত বছরের অক্টোবরে ওয়াশিংটনে আয়োজিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সভায়ও বলা হয়েছিল, নির্বাচিত প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা শেষে পরবর্তী কিস্তি মুক্তি দেওয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আইএমএফ যে শর্তগুলো দিয়েছে সেগুলো একবারেই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নাও হতে পারে; যা সম্ভব সেগুলো দ্রুত করা হবে এবং যেখানে প্রয়োজন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। বৈঠক শেষে কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনও সাংবাদিকদের বলেছেন, ঋণ কর্মসূচি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং এ বিষয়ে আরও আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হবে।













