সরকার নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও দেশের অনেক শ্রমিক এখনও ঈদ বোনাস পাননি বলে অভিযোগ তুলেছেন তারা। শ্রমিক নেতা ও ইউনিয়নগুলোর দাবি, প্রায় ৫৪ শতাংশ কারখানায় এখনও ঈদ বোনাস পরিশোধ হয়নি। অন্যদিকে তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠনগুলো বলছে, অধিকাংশ কারখানায় বেতন ও বোনাস ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে।
ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত
গত ৩ মার্চ রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে ত্রিপক্ষীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফেব্রুয়ারির বেতন ৯ মার্চের মধ্যে এবং ঈদ বোনাস ১২ মার্চের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। পরে শ্রমিক সংগঠন ও সরকারের পক্ষ থেকে ২০ রমজানের মধ্যে বেতন-বোনাস দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান
বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, তাদের ২ হাজার ২১৭টি সদস্যভুক্ত কারখানার মধ্যে ২ হাজার ২১৬টি জানুয়ারির বেতন দিয়েছে। ফেব্রুয়ারির বেতন দিয়েছে ২ হাজার ৯০টি এবং ৪৭৮টি প্রতিষ্ঠান মার্চের অগ্রিম বেতন পরিশোধ করেছে। তাদের তথ্যে বোনাস দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৫১টি কারখানায়, যা ৯৬ শতাংশের বেশি। বিকেএমইএ জানিয়েছে, তাদের সদস্যভুক্ত কারখানার ৯৮.৬৭ শতাংশ ফেব্রুয়ারির বেতন এবং ৯৬.৫৫ শতাংশ ঈদ বোনাস দিয়েছে।
শ্রমিক নেতাদের বিরূপ চিত্র
তবে শ্রমিক নেতারা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছেন। গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, “মালিকরা প্রতিবারই একই কথা বলে। সরকার ও শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সময়ও দেওয়ার পর অনেক কারখানায় বেতন-বোনাস এখনও পরিশোধ হয়নি।” তিনি অভিযোগ করেছেন যে বাস্তবে অনেক কর্মীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এখনো অর্থ ঢুকেনি।
আরেক শ্রমিক নেতা জলি তালুকদার বলেন, “পুরো বছর শ্রমিকরা কঠোর পরিশ্রম করে; তাদের শ্রমের ওপরেই বড় কারখানা দাঁড় করিয়েছে মালিকরা। তবু শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি বা সময়মতো বেতন-বোনাস পাচ্ছেন না। প্রতিবছর ঈদের সময় এসব সমস্যা পুনরাবৃত্তি হয়—এর জন্য মালিকদের মনোভাব বদলানো জরুরি।”
মালিক ও সংগঠনের জবাব
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “অন্য বছরের তুলনায় এবারের বেতন-বোনাস দ্রুততম সময়ে প্রদান করা হয়েছে। সদস্যভুক্ত প্রায় শতভাগ কারখানায় ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস দেওয়া হয়েছে; দু-একটি বাকি থাকতে পারে। আমরা ঈদের আগে বোনাস নিশ্চিত করতে নিবিড় মনিটরিং করছি।” তিনি সরকারের ও বাংলাদেশের ব্যাংকের সমন্বিত পদক্ষেপকে এ ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর কারণ দেখিয়েছেন এবং সরকারের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
হাতেম আরও উল্লেখ করেন যে, দেশে সব গার্মেন্ট কারখানার তথ্য শিল্পপুলিস বা গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে থাকে এবং সেখানে অনেক ছোট বা অ-সদস্য কারখানাও থাকতে পারে। ফলে এইসব অ-সদস্য প্রতিষ্ঠান বেতন-বোনাস না দিলেও দায় অনেক সময় বিজিএমইএ বা বিকেএমইএ-র ওপর এসে পড়ে, যা তিনি অযৌক্তিক বলে সমীচীন প্রমাণের দাবি করেছেন।
দুই পক্ষের টানাপোড়েন
বিকেএমইএয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, যদি কোথাও বেতন-বোনাস না দেওয়া হয়—তার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ দিলে তারা সংশ্লিষ্ট মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যার সমাধান করবে। অন্যদিকে শ্রমিক নেতারা বলছেন, মৌখিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব প্রদানে তৎপরতা দেখতে চান। কিছু শ্রমিক সংগঠন সরকারের প্রদত্ত অর্থকে ব্যাংক ঋণের বদলে প্রণোদনা হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও আলোচনা রয়েছে—তবে বিকেএমইএ এসব অভিযোগ অবাস্তব বলে জানায় এবং বলেছে, ব্যাংক তহবিল সরাসরি শ্রমিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়, তাই তা অন্যখাতে ব্যবহার হওয়ার সুযোগ নেই।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারি নির্দেশনা ও তদারকি বা মনিটরিং চলমান রয়েছে। তবুও খাতটিতে সময়মতো বেতন-বোনাস প্রদান প্রশ্নে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে তথ্য ও অভিজ্ঞতার বৈপরীত্য বজায় আছে, যা দ্রুত সমাধান না হলে সামাজিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।














