আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হতে এখনও তিন মাসেরও কম সময় বাকি। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও তার ফলে তুলে উঠা নিরাপত্তা উদ্বেগ ইরানকে টুর্নামেন্টে দেখা যাবে কিনা—এমন প্রশ্ন ফের আলোচনায় এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাত এখনই দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। এটি আর কেবল আঞ্চলিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; সংঘাতের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত প্রভাব ধীরে ধীরে বৈশ্বিক পর্যায়ে ছড়াচ্ছে। আলাদা দেশে আয়োজিত আর্থ-সামাজিক ও ক্রীড়া ইভেন্টগুলোও তার প্রভাব থেকে বাদ যাচ্ছে না। এরই মধ্যে আগামী ১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপও সেই প্রভাবের বাইরে থাকছে না।
ইরানের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নানা মন্তব্য সামনে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপ বাড়ার পর ইরান নিজেই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে; এরপর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েও এই বিষয় আলোচিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানকে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন না এবং তাদের সরে দাঁড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
এদিকে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করার পর জানান যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে বিশ্বকাপে স্বাগত জানাবে—তবে পরে ট্রাম্প আবারও ইরানকে টুর্নামেন্ট থেকে সরে আসার পরামর্শ দেন এবং বলেন, নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
ইরানের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট বার্তা এসেছে। দেশটির জাতীয় ফুটবল দলের অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “বিশ্বকাপ একটি ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক আয়োজন। এর নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা—কোনো ব্যক্তি বা দেশ নয়। ইরানের সাহসী ফুটবলাররা কঠোর পরিশ্রম ও ধারাবাহিক সফলতার মাধ্যমে এই বড় টুর্নামেন্টে যোগ্যতা অর্জন করেছে।” বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “নিশ্চিতভাবে কেউ ইরান জাতীয় দলকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিতে পারবে না। বরং বাদ পড়তে পারে সেই দেশ, যারা শুধু ‘আয়োজক’ নামটি বহন করে কিন্তু অংশ নেওয়া দলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা রাখে না।”
ট্রাম্প তার সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ এক পোস্টে লিখেছিলেন, “ইরান জাতীয় ফুটবল দলকে বিশ্বকাপে স্বাগত। কিন্তু তাদের নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করলে সেখানে থাকা তাদের জন্য উপযুক্ত হবে বলে আমি সত্যিই মনে করি না।” এই ধরণের মন্তব্য তাত্ক্ষণিকভাবে আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কও তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনো আয়োজক দেশ কোনো দলের অংশগ্রহণ নাকচ করে, তাহলে ফিফা আয়োজক স্বত্বও পর্যালোচনা করে থাকতে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় তিন বছর আগে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে ইসরায়েলকে স্বাগত জানাতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে ইন্দোনেশিয়ার কাছ থেকে আয়োজক স্বত্ব তুলে নেয়া হয়েছিল এবং পরে টুর্নামেন্টটি আর্জেন্টিনায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল—এমন ইতিহাস রয়েছে।
ফুটবল আয়োজকরা ও নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষরা এখন পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন। কিভাবে ক্রীড়াবিদ, দর্শক ও আয়োজকরা সবাই নিরাপদভাবে টুর্নামেন্টে অংশ নিতে পারবেন, সেটাই প্রধান প্রশ্ন। ইরান যদি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, তাহলে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও ক্রীড়া কিভাবে স্বচ্ছ ও নিরাপদভাবে আয়োজিত হয়—তাও এক পরীক্ষার বিষয় হবে।
সূচি অনুযায়ী, ইরান তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ১৫ জুন ক্যালিফোর্নিয়ায় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। এরপর ২১ জুন একই ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলবে এবং গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ ২৬ জুন সিয়াটলে মিসরের বিপক্ষে অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্বকাপের শুরু ঘনিয়ে আসছে; কিন্তু ইরানের অংশগ্রহণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমাধান না এলে ফুটবল ও রাজনীতি—দুই ক্ষেত্রেই উত্তেজনা টিকে থাকবে।














