ঢাকা | বুধবার | ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ৮ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

পাঁচ বছর পরেও চালু হয়নি ৫ কোটি টাকার পানিসেবা প্রকল্প

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর পৌরসভার ভেতরে অবস্থিত প্রায় পাঁচ কোটি টাকার মূল্যবান ভূগর্ভস্থ পানি শোধনাগার নির্মাণের পাঁচ বছর পেরিয়েছে, তারপরও এটি এখনো চালু হয়নি। ২০২১ সালে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরে একদিনও এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি সচল করা হয়নি, যার ফলে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ বিশুদ্ধ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত থেকে যান। দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থায় এটি এখন পরিত্যক্ত স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। পাম্প হাউস, ওভারহেড ট্যাংক, রিজার্ভ ট্যাংকসহ অন্যান্য অংশের চারপাশ ঝোঁপঝাড়ে ঢাকা থাকায় পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। মূল্যবান যন্ত্রাংশ যেমন স্লুইচবোর্ড, মোটর, ফিল্টার, পাইপ, জেনারেটর ও ইলেকট্রিক ট্রান্সফরমার চুরির শিকার হয়েছে বা বিকল হয়ে গেছে। পাম্প গ্যালারি ও মূল কন্ট্রোলরুমে থাকা প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশও অব্যবহৃত। ভবনগুলোতে দেখা গেছে ফাটল, দরজা ও জানালা নষ্ট। অভিযোগ উঠেছে, কাজের শুরুতেই তৎকালীন মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের অনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে প্রকল্পের মূল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি সঠিকভাবে কাজ করতে পারেনি। পরে তাদের বদলে মেয়রের নিজের লোকজন দিয়ে কাজ সম্পন্ন করতে বাধ্য হন প্রকল্পের দায়িত্বরত কর্তৃপক্ষ। এর ফলে, কাজের মধ্যে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা ভয়াবহ আকার ধারন করে।স্থানীয়দের ভাষ্য, রাতে নিয়মিত চুরি ও যন্ত্রাংশ অপসারণের ঘটনা ঘটলেও, প্রশাসনের নজরদারির অভাবে এগুলো রোধ সম্ভব হয়নি। ২০১৭ সালে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এই শোধনাগারটির নির্মাণ কাজ শুরু করে, যা ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়। প্রকল্পের মধ্যে ছিল ভূগর্ভস্থ পানি শোধনাগার, পাম্প হাউস, ওভারহেড ট্যাংক ও ৩০০টি পাইপ সংযোগ। পরে পৌরসভা নিজ উদ্যোগে আরও ২০০টি সংযোগ স্থাপন করে। প্রকল্পের ক্ষমতা ছিল দৈনিক ৩ হাজার ৫০০ ঘনমিটার পানি সরবরাহের, কিন্তু এ অবধি এক ফোঁটা পানি সরবরাহও সম্ভব হয়নি। পৌর কর্তৃপক্ষ জানায়, এই শোধনাগারটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি, ফলে তারা পাম্প পরিচালনা বা কার্যক্রম চালানোর সুযোগ পাচ্ছে না।অপরদিকে, উপজেলা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরে তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাজিব হাসান রাজু বলেন, ‘আমরা নিয়ম মেনে কাজ সম্পন্ন করে পৌর কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছি। কিন্তু পৌরসভার নথিপত্র পরীক্ষা করে দেখা যায়নি যে হস্তান্তর অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়েছে।’স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই প্রকল্পটি মনির ট্রেডার্স নামে একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান পায়। কিন্তু, তৎকালীন শাসক দলের কিছু নেতার অনৈতিক চাপ ও হস্তক্ষেপের ফলে প্রকল্পের কাজ অন্য সংগঠনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এমনকি, মূল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে কাজটি নিয়েছে জীবননগর রুপা কনস্ট্রাকশন নামের এক কোম্পানি।জীবননগর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, ‘প্রকল্পের প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল লোকবল না থাকায় সিস্টেম চালু করা সম্ভব হয়নি। শোধনাগার পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত অপারেটর ও টেকনিশিয়ানের প্রয়োজন। স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন, প্রকল্পের যন্ত্রাংশ চুরি বা নষ্ট হওয়ার পর কাজের মান কতটা ছিল?’তারা আরও বলেন, ‘কয়েক মাস টেস্ট চালানোর পর যদি প্রকল্প হস্তান্তর করা হত, তবে এখন ভবন, পাম্প ও কোয়ার্টার সবই ভাঙা-খোড়া। এত বড় অর্থের প্রকল্পটি এখন পৌরসভার কর্মীদের আবাস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।’পৌরবাসীর আকাঙ্ক্ষা, দ্রুত যন্ত্রাংশের মেরামত ও পুনঃস্থাপন, প্রকল্পে যুক্ত ব্যক্তিদের তদন্ত, শোধনাগারটি চালু করে বিশুদ্ধ পানির সুবিধা প্রদান ও ভবিষ্যতে এমন অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ করা। পাঁচ বছর ধরে বন্ধ এই জীবননগর পানি শোধনাগার প্রকল্পটি শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ই নয়—এটি একটি মৌলিক পানির সুবিধা থেকে মানুষের বঞ্চনার বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর, ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের অবহেলা ও দুর্নীতির কারণেই এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি আজ সম্পূর্ণ অচল; দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।