ইসরায়েলে থাকা মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবির সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন সাংবাদিক ও উপস্থাপক টাকার্স কার্লসন এবং তার টিমের সদস্যরা। তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং কিছু সময় পাসপোর্ট জব্দ রাখার কথাও বলা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাতের আগে কার্লসন ও হাকাবির মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিক্ত বাকবিতণ্ডা চলছিল। হাকাবি ইহুদিদের অধিকারের বিপক্ষে নয় এমন বক্তব্য দিয়ে থাকেন; তিনি ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইহুদিদের বসতি স্থাপনের ‘ঐশ্বরিক অধিকার’ বলেও দাবি করেছেন এবং ফিলিস্তিনিদের জাতীয় পরিচয় অস্বীকার করার মতো মন্তব্য করেছেন — যা কার্লসনকে সাক্ষাৎকারে যেতে প্ররোচিত করেছে।
কার্লসন বলেন, তিনি ইসরায়েলে খ্রিস্টানদের উপর প্রতি দিনের হয়রানির অভিযোগ তুলে ধরতে গিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি— অধিকৃত পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমে অনেক খ্রিস্টান থুতু নিক্ষেপ, শারীরিক হুমকি, কবরস্থান ও ব্যক্তিগত সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বাধা—এসবের শিকার হচ্ছে এবং এই বিষয়ে হাকাবি প্রশাসন ব্যর্থ।
ডেইলি মেইলকে দেওয়া একটি বিবৃতিতে কার্লসন জানান, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা তাদের পাসপোর্ট জব্দ করে একজন সহকর্মীকে আলাদা কক্ষে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘যারা নিজেদের বিমানবন্দর নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল তারা আমাদের পাসপোর্ট নিয়েছিল এবং আমাদের নির্বাহী প্রযোজককে পাশের কক্ষে নেয়া হয়েছিল। তারা জানতে চেয়েছিল রাষ্ট্রদূত হাকাবির সঙ্গে আমরা কী আলোচনা করেছি। বিষয়টি ছিল অদ্ভুত।’’ পরে তারা দেশ থেকে বেরিয়ে আসেন।
কার্লসন সাক্ষাৎকারের আগে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর থেকে নিজের একটি ছবি পোস্ট করে ইসরায়েল থেকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে লক্ষাধিক অনুসারীর কারণে তিনি সমুচিতভাবে প্রভাবশালী কণ্ঠ হয়ে ওঠা রয়েছে, বিশেষত ডানপন্থী দর্শকদের মধ্যে। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রভাব, ইরান ও অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে সংঘাতের বিষয়ে আমেরিকাকে জড়ানোর চেষ্টা এবং প্রো-ইসরায়েল লবির ভূমিকার সমালোচনা করে আসছেন।
কার্লসন গাজায় ইসরায়েলের বর্ণনা ‘গণহত্যা’ বলে অভিহিতও করেছেন। এর ফলে গত ডিসেম্বরে একটি প্রো-ইসরায়েল আমেরিকান লবিং গ্রুপ তাকে ‘বছরের ইহুদিবিদ্বেষী’ হিসেবে আখ্যা দেয়। ডেইলি মেইলের রূপে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ প্রথমে তাকে দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা ভাবেছিল, যা নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা হয়। পরে কূটনৈতিক সম্ভাব্য সংকট এড়াতে ইসরায়েল তাকে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেয় বলে চ্যানেল ১৩ জানিয়েছে।
ইসরায়েলে থাকা মার্কিন দূতাবাস এই পুরো প্রক্রিয়াকে ‘‘স্বাভাবিক পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম’’ বলে অভিহিত করেছে এবং দেশে আসা/যাওয়া করার সময় কার্লসনসহ অন্যান্য দর্শনার্থীদের একই নিয়মে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে পড়ার কথা জানাচ্ছে। দূতাবাসের এক প্রতিনিধি বলেন, ‘‘শুধু সাক্ষাৎকারের জন্যই তিনি বিশেষভাবে অনুমতি পেয়েছিলেন—এ ধরনের দাবি সঠিক নয়; অন্য যেকোনো দর্শনার্থীর মতোই তিনি ইতিবাচক আচরণ পেয়েছেন।’’
কার্লসনের আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ নিয়ে আমেরিকার কিছু কনজারভেটিভ রাজনীতিকও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সাবেক কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেইলর গ্রিন বলেছেন, ‘‘আমেরিকান নাগরিক ও সাংবাদিক টাকার্স কার্লসনকে ইসরায়েলে আটক করা হয়েছে… আমরা এটি সহ্য করব না’’ এবং বিষয়টিকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন।
এই ঘটনা ইসরায়েল-আমেরিকা সম্পর্ক, মিডিয়া ও কূটনীতিতে বিরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উত্তেজনার সংবেদনশীলতা উভয় ক্ষেত্রেই নতুন বিতর্ক উস্কে দিয়েছে।














