নতুন সরকার দেশের এমন এক অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ক্ষমতা নিলো, যেখানে বাইরে থেকে সহজ সমাধান নেই। মঙ্গলবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেওয়ার সাথে সাথে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের দায়িত্বও শেষ হলো। তিনি ‘বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঝুঁকি এবং নীতি-অগ্রাধিকার’ শীর্ষক একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ন উত্তরাধিকার নোট রেখে গেছেন, যা নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়ায়। নোটে দেশের আর্থিক চিত্র এতটাই তীব্রভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে তা আগামী দিনের নীতিনির্ধারণের জন্য বড় ধরনের পরীক্ষার ইঙ্গিত দেয়—বিশেষত ঋণের সুদ ও ব্যাংকিং খাতের ক্ষতই সবচেয়ে ভোগান্তিকর ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
উত্তরাধিকার নোটে অর্থ উপদেষ্টা ব্যাখ্যা করেছেন যে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের তাগিদে নীতিগুলো কঠোর করার ফলে প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব সংগ্রহ তুলনামূলকভাবে নিচু অবস্থায় আছে এবং শাসনব্যবস্থায় দুর্বলতার কারণে বাজেট ঘাটতি মেটাতে দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। নিয়মিত বড় অঙ্কের ঋণের সুদ পরিশোধে অর্থনীতির প্রাণশক্তি ক্ষয় হওয়া একটি প্রধান উদ্বেগ—এ কারণে সরকারি অর্থনৈতিক ক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে। তিনি নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন যে, এ পরিপ্রেক্ষিতে এখনই নতুন কোনো উচ্চাভিলাষী প্রকল্প শুরু করার চেয়ে চলমান সংস্কারগুলোকেই দৃঢ়ভাবে চালিয়ে নেওয়া নিরাপদ ও কার্যকর হবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ব্যাংকিং খাতের অবস্থা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)–এর গবেষণাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, গত ১৫ বছরে ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম-লুঠপাট হয়েছে। বর্তমান অবস্থায় মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ খেলাপি—এই প্রেক্ষাপট ব্যাংকিং কাঠামোকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে এনে শক্তিশালী আইনি ও নীতিগত ভিত্তি গড়ে তোলা হবে নতুন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
নোটে আরও উল্লেখ আছে যে, সেপ্টেম্বরের মধ্যে আমানত ও ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক করার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু খেলাপি ঋণ ও পুঁজি ঘাটতির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ তাৎপর্যপূর্ণ হারে কমেছে। সংকট মোকাবেলায় পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করা এবং অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগের কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে; এ কার্যক্রমের ব্যয়ভার থেকে সরকারকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বোঝা বহন করতে হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ড. সালেহউদ্দিনের সময়টা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং; নানা পদক্ষেপের পরও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি এবং বাস্তব আয়ে হ্রাস দেখা গেছে। তবুও তার একটি ইতিবাচক পূর্বাভাস ছিল—সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও কড়াকড়ি ফলশ্রুতিতে আগামী জুন নাগাদ মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭ শতাংশে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি সমন্বিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার গুরুত্বও একবারের জন্য জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন। বৈদেশিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে রপ্তানি আয় বাড়ানোয় বিশেষ জোর দিয়েছেন, কারণ বর্তমান রপ্তানির প্রবৃদ্ধি আমদানি বৃদ্ধির তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রথম কার্যদিবসে অর্থ বিভাগের সচিব আনুষ্ঠানিকভাবে এই উত্তরাধিকার নোটটি হস্তান্তর করবেন। নোটে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য ভ্যাট অটোমেশন ও ই-ইনভয়েস দ্রুত চালু করা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অভ্যন্তরীণ সংস্কার কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা—এসব সুপারিশ রয়েছে। নোটের সারমর্ম: বাজারে আস্থা ফিরে ana এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করাই হবে নতুন অর্থমন্ত্রীর তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার।
সব মিলিয়ে, ঋণের সুদঢাঁই ও ব্যাংকিং খাতের ক্ষত সারিয়ে অর্থনীতিকে সচল করা নতুন প্রশাসনের সবচেয়ে কঠিন কাজ হবে। উত্তরাধিকার নোটে যে নীতিগত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো কতটা দক্ষভাবে এবং দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়—তাই নির্ধারণ করবে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি ও স্থিতিশীলতা।














